হাবিবুর রহমান সুজন।
সালামি আর নিছক কোনো লেনদেনে আটকে নেই। বরং হয়ে উঠছে অনুভূতি প্রকাশের এক নতুন, সৃজনশীল ও শৈল্পিক মাধ্যম।
ঈদের সকাল মানেই নতুন পোশাক, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেমাই, ফিরনি-পায়েস, পোলাও কিংবা কোরমার গন্ধ, আর চারদিক জুড়ে ছড়িয়ে পড়া উৎসবের আমেজ। এ সময়ে বাড়ি বাড়ি চলে ঈদের নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি। নতুন পাঞ্জাবি, টুপি আর গায়ে আতরের সুবাস মেখে দলে দলে ছেলে-বুড়োরা হেঁটে যায় ঈদগাহের দিকে। নামাজ শেষে শুরু হয় ‘ঈদ মুবারক’ শুভেচ্ছা বিনিময়ের উষ্ণতা, আর হাসিমাখা মুহূর্ত। আর বাড়ির ছোটরা এই সময়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে বড়দের। কারণ কোলাকুলি আর শুভেচ্ছা আদান-প্রদানের পরেই আসে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত- ‘সালামি পর্ব’। ছোটরা একে একে বড়দের সামনে গিয়ে সালাম করে, আর বড়রা স্নেহভরা হাসি দিয়ে সে সালাম গ্রহণ করে হাতে গুঁজে দেন কিছু টাকা।
একসময় এই ‘সালামি প্রদান’ ছিল খুবই সহজ আর আন্তরিক এক রীতি। টাকার নোটগুলো হতো কখনো পুরোনো, কখনো নতুন। আর যদি নতুন কড়কড়ে নোট হয়, তাহলে আনন্দটাও হতো দ্বিগুণ। টাকার অঙ্কটা যে খুব বড় হতো তা একেবারেই নয়। কিন্তু তাতে যে ছোটদের সরল আনন্দ আর উচ্ছ্বাস এবং বড়দের স্নেহ-ভালোবাসা জড়িয়ে থাকত, সেটিই ছিল আসল প্রাপ্তি।
সময় বদলেছে। সঙ্গে বদলেছে চিরচেনা এই রীতির প্রকাশভঙ্গিও। এখন আর সালামি শুধু হাতে তুলে দেওয়া কিছু টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে নান্দনিক এক উপহারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, কীভাবে এই মজার রীতি জায়গা করে নিয়েছে ক্রাফটিং শিল্পে।
টাকার নোটগুলোকে যত্ন করে ভাঁজ করে বানানো হচ্ছে ফুলের পাপড়ির মতো, কখনো কখনো কোনো ফুলের আদলে। তারপর চারপাশে সাজানো হচ্ছে কৃত্রিম ফুল, গ্লিটার সাজসজ্জা। তৈরি শেষে মোড়ানো হচ্ছে রঙিন র্যাপিং কাগজে। কখনো নীল, কখনো গোলাপি, আবার কখনো লাল। দেখতে যেন কোনো কাঁচা ফুলের তোড়ার মতোই।
কেউ প্রিয় মানুষকে চমকে দিতে এটি বেছে নিচ্ছেন, কেউ আবার কাউকে বিশেষ অনুভব করাতে। ফলে বলা যায় সালামি আর নিছক কোনো লেনদেনে আটকে নেই। বরং হয়ে উঠছে অনুভূতি প্রকাশের এক নতুন, সৃজনশীল ও শৈল্পিক মাধ্যম।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো থেকেই মূলত জনপ্রিয় হয়েছে এই ট্রেন্ড। এই প্রসঙ্গে কথা বলেছিলাম অনলাইনভিত্তিক ক্রাফটিং নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তা ইসমত আরার সঙ্গে। তার গল্পটাও নতুন এই ট্রেন্ডের সঙ্গে বেশ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
২০২১ সালে ক্রাফটিং নিয়ে অনলাইনে ছোট পরিসরে ‘Ara’s Flair’ (আরা’স ফ্লেয়ার) পেইজের কাজ শুরু করলেও, ২০২৩ সালেই তার কাজে আসে বড় এক মোড়। সে সময় বাহরাইনে বসবাসকারী একজন প্রবাসী গ্রাহক তাকে প্রথমবারের মতো টাকা দিয়ে ফুলের তোড়া বানানোর ধারণা দেন। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে আরও আগে থেকেই এ রীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু আইডিয়াই নয়, কীভাবে এটি তৈরি করা যায়, কী কী উপকরণ লাগবে সবকিছু নিয়েই ইসমতকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু। নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকে ইসমতও হাত বাড়ান ভিন্নধর্মী কাজটিতে। কাজের শুরতেই বেশ সাড়া মেলে তার। যদিও বাংলাদেশে এটি খুব পরিচিত কোনো ট্রেন্ড হয়ে ওঠেনি তখন।
তার ভাষ্যে, ২০২৫ সাল থেকেই কাজটা আসলে বেশি চোখে পড়তে শুরু করে। ২০২৩ সালে যখন তিনি প্রথম শুরু করেন, তখন আশপাশে তেমন কাউকে এই ধরনের তোড়া বানাতে দেখেননি। কিন্তু ২০২৫-এ এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেককেই এই কাজে যুক্ত হতে দেখেন। তিনি বলেন, “২০২৫ সালে বিদেশি এক গ্রাহক ডলার দিয়ে তোড়া বানানোর অনুরোধ করেছিলেন। হাতে ডলার না থাকায় আমি সেটা টাকায় তৈরি করে দিই। এই কাজের ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে। ঐ সময় প্রায় ২৫ মিলিয়ন ভিউ হয়।”
তিনি মনে করেন, এরপর থেকেই বিষয়টি আরও বেশি মানুষের নজরে আসে। কারণ বছরের শেষ দিকে এসে তিনি খেয়াল করেন, তাকে দেখে অনেকেই এই কাজ শুরু করছেন। কারণ গ্রাহকরা বেশ পছন্দ করছিলেন এই কাজ।
তার ভাষ্যে, চাহিদার দিক থেকেও পরিবর্তনটা স্পষ্ট। ইসমত এই রমজানেই প্রায় দুই শতাধিক তোড়ার অর্ডার পেয়েছেন। অথচ শুরুর দিকে অর্ডারের সংখ্যা এত ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে মানুষ প্রিয়জনকে সালামি দেওয়ার এই ভিন্নধর্মী উপায়টি বেশ পছন্দ করছে। তারমধ্যে গ্রাহকদের একটি বড় অংশই হচ্ছে পুরুষ, এবং তাদের বেশিরভাগই প্রবাসী। দূরে বসে দেশের প্রিয়জনকে একটু ভিন্নভাবে খুশি করার জন্যই তারা এই তোড়াগুলো অর্ডার করছেন।
অনলাইনে এই সালামির তোড়া অর্ডার করার প্রক্রিয়াও ব্যাখ্যা করেন ইসমত। অর্ডার নেওয়া হয় মূলত দুইভাবে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ অগ্রিম, অথবা পুরো টাকা ইসমত নিজের থেকে ব্যয় করেন।
“তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি আমার টাকা থেকে করি। সেক্ষেত্রে আমাকে টাকাগুলো কিনে নিতে হয়। নতুন টাকার নোট কিনতে যত লাগে সে হিসেবে আমি মেকিং চার্জ রাখি।”- জানালেন ইসমত।
অবশ্য মেকিং চার্জ নির্ধারণেও রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। কতগুলো নোট ব্যবহার হচ্ছে, কত টাকার নোট, মোট টাকার পরিমাণ, সাজসজ্জার ধরন, ফুল বা চকলেট ব্যবহার হচ্ছে কি না, এই সবকিছুর ওপর নির্ভর করে খরচ।
যেমন, ২০০০ টাকার একটি তোড়া যদি ১০০ টাকার নোট দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে মেকিং চার্জ একরকম। কিন্তু একই টাকায় ২০ বা ১০ টাকার নোট দিয়ে তৈরি করতে গেলে নোটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শ্রম বাড়ে, ফলে খরচও বাড়ে। তার দেওয়া হিসেবে, ১০০ টাকার নোটে যেখানে মেকিং চার্জ প্রায় ৮০০ টাকা, সেখানে ২০ টাকার নোটে তা দাঁড়ায় ১৪০০-১৫০০ টাকায়, আর ১০ টাকার ক্ষেত্রে আরও বেশি। এই পর্যন্ত সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা পর্যন্ত মেকিং চার্জ (বানানোর পারিশ্রমিক) নিয়েছেন ইসমত। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় কখনোই তাকে আস্থার সংকটে পড়তে হয়নি। পণ্য পেয়েই গ্রাহকরা ঠিকঠাকভাবে অর্থ পরিশোধ করেছেন।
বলা ভালো, তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু উপহার দিতে চায় না, তারা চায় সেটি যেন হয় দেখতে সুন্দর আর আলাদা। ফলে সালামি এখন ‘প্রেজেন্টেশন’-এর বিষয়ও। আর নতুন এই কাজের চাহিদাকে কেন্দ্র করে অল্প পুঁজির উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী বা গৃহিণীদের জন্য এটি হয়ে উঠছে আয়ের একটি সম্ভাবনাময় পথ।
তবে এই পরিবর্তনের ভেতরে প্রশ্ন ওঠে- সালামির আদিম আনন্দ কি এতে বদলে যাচ্ছে? উত্তরটা দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আহনাফ আমীন। “এত আয়োজনের ভিড়ে আগের সেই সহজ, আন্তরিক মুহূর্তটা হয়তো একটু ফিকে হয়ে যাচ্ছে”, বলেন তিনি।
আবার এই সালামী তোড়ার একজন ক্রেতা নুসরাত তোফা বলেন, “সময়ের সঙ্গে রীতির রূপ বদলানোই স্বাভাবিক। মূল বিষয়টা তো ভালোবাসা আর খুশি ভাগাভাগি করা। সেটা যেভাবেই করা হোক, কারো ভালো লাগাটাই হচ্ছে আসল বিষয়।”
হয়তো সত্যিটা মাঝামাঝিই কোথাও। কারণ আজকের এই নান্দনিক সালামি তোড়া যেমন নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার প্রকাশ, তেমনি এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে পুরোনো দিনের সেই ভালোবাসারই নতুন রূপ।
ছবি: সৌজন্যে প্রাপ্ত