হাবিবুর রহমান সুজন।
বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদ মানেই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সম্প্রীতি আর সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র। চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মারমা, ত্রিপুরা, পাংকু সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আর এই বৈচিত্র্যের মাঝেই পাহাড়ি নারীরা গড়ে তুলছেন এক দৃঢ়, পরিশ্রমী ও আত্মনির্ভর জীবনের গল্প।
পাহাড়ি জনপদের নারীরা শুধুমাত্র গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ নন; তারা কৃষিকাজ, জুমচাষ, বুননশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ভোরের আলো ফুটতেই তারা পাহাড়ের ঢালে কাজ শুরু করেন—কেউ জুমে যান, কেউবা হস্তশিল্প তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাদের হাতে তৈরি রঙিন পোশাক, নকশা করা কাপড় ও অলংকার স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে শহরেও সমাদৃত হচ্ছে।
ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধন পাহাড়ি জীবনের মূল শক্তি। বৌদ্ধ বিহারের প্রার্থনা, মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি কিংবা গির্জার প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এখানে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব মিলনমেলা। উৎসবগুলোও সবাই মিলে ভাগাভাগি করে উদযাপন করেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন।
পাহাড়ি নারীদের জীবন সংগ্রামমুখর হলেও তাদের মুখে থাকে আত্মবিশ্বাসের হাসি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। অনেক নারী এখন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি নারীদের দক্ষতা ও ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। তাদের হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে পাহাড়ের জীবনযাত্রা যেমন রঙিন ও বৈচিত্র্যময়, তেমনি সংগ্রাম ও সম্ভাবনায় ভরপুর। এই পাহাড়ি নারীরাই তাদের পরিশ্রম, মেধা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে তুলছেন এক নতুন আগামী—যেখানে সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও মানবিকতার জয়গান প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিদিন।
— দেশ সকাল