1. live@www.deshsokal.com : দেশ সকাল : দেশ সকাল
  2. info@www.deshsokal.com : দেশ সকাল :
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী - দেশ সকাল
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

প্রতিনিধির নাম :
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ১৮ বার পড়া হয়েছে

মেজর মো. জিল্লুর রহমান, পিএসসি, পদাতিক

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মাবলির ব্যতিক্রম যখন বিপর্যয় ডেকে আনে, তখনই সৃষ্টি হয় দুর্যোগময় পরিস্থিতির। এই ধরনের দুর্যোগের মূল উৎস কখনো হয়ে থাকে প্রকৃতির আপন খেয়ালে-কখনো আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে, কখনো ভূ-অভ্যন্তরের আলোড়নে, আবার কখনো জলবায়ুর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে। প্রকৃতির এই অপ্রত্যাশিত আচরণ মানব জীবনে নিয়ে আসে এক গভীর অনিশ্চয়তা, যেখানে মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায় মানুষের বহুদিনের সঞ্চিত স্বপ্ন আর নিরাপত্তা। জীবনহানির মতো চরম ক্ষতি থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তির বিনাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এই ধ্বংসলীলার কালো থাবায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পূর্বাভাস দেওয়ার সীমাবদ্ধতা। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান দুর্যোগের আগমন বার্তা কিছুটা হলেও আগে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু এর তীব্রতা এবং আঘাত হানার সঠিক সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া আজও এক দুরূহ কাজ। প্রকৃতির এই রহস্যময় শক্তির কাছে মানুষ বড়ই অসহায়। বিশেষত বাংলাদেশ, একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানকার মানুষের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের নামান্তর।

উন্নত বিশ্বের মতো দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এ দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ভূখণ্ড। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদ-নদী এ দেশের জীবনরেখা হলেও, বর্ষাকালে এই নদীগুলোই বন্যার মতো ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতি বছর বর্ষার আগমনের সাথে সাথেই দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়, কেড়ে নেয় ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদি পশু এবং বিপর্যস্ত করে তোলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

বন্যার পানি শুধু স্থবিরতাই নিয়ে আসে না, রোগের বিস্তার ঘটায়, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে। বন্যা ছাড়াও বাংলাদেশে আরও নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতভাবে আঘাত হানে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় এ দেশের জন্য এক চিরন্তন হুমকি। এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ে, যার সাথে যোগ হয় ভয়াল জলোচ্ছ্বাস। এই ঘূর্ণিঝড়গুলো শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, কেড়ে নেয় বহু মূল্যবান জীবন এবং লোনা পানিতে প্লাবিত করে কৃষিজমি, যা দীর্ঘকাল ধরে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
উত্তর-পশ্চিমবঙ্গে খরার প্রকোপও কম নয়। শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘকাল বৃষ্টি না হওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে যায়, দেখা দেয় তীব্র খরা। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, খাদ্য সংকট তৈরি হয় এবং পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে, নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি স্থায়ী সমস্যা। প্রতি বছর নদীর তীরবর্তী এলাকার বহু মানুষ তাদের বসতভিটা, জমিজমা নদীর গর্ভে বিলীন হতে দেখে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বড় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা কম। তবে ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় মাঝারি বা তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পও এখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম। এছাড়া বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি এবং কালবৈশাখীর মতো আকস্মিক দুর্যোগও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিতভাবে আঘাত হানে এবং ফসলের ক্ষতিসহ নানা ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধিও একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা যা কৃষিজমি ও মিঠা পানির উৎসকে দূষিত করে তুলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেই একটি বড় বাধা নয় বরং এটি পরিবেশগত ভারসাম্যকেও নষ্ট করে দেয়। দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুতি ঘটে, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু দুর্যোগ নিয়মিত এবং বেশি তীব্রতা নিয়ে দেখা যায়। নিচে পরিসংখ্যানসহ প্রধান কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য তুলে ধরা হলোঃ

বন্যা বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত এবং প্রায় প্রতি বছর ঘটা দুর্যোগ। বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা দেখা দেয়। বন্যা বাংলাদেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা প্লাবিত করতে পারে। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ এবং ২০১৭ সালের দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক বন্যা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৬৮% এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত বন্যায় প্রায় ১ কোটি ৮৩ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলে বেশি দেখা যায়, তবে উপকূলীয় অঞ্চলও জলাবদ্ধতার শিকার হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। সাধারণত এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেশি থাকে। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলাও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল যা উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সিডরে প্রায় ৩,৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০০৩ সালের অক্টোবর থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত গত তিন বছরে বাংলাদেশে ৪টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে যার মধ্যে রেমাল, মিধিলি ও হামুন অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় এলাকার জন্য একটি বড় হুমকি।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা একটি নিয়মিত ঘটনা। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে (মার্চ-মে) এর প্রকোপ বাড়ে। ১৯৭৮-৭৯, ১৯৯৪-৯৫ এবং ২০০০-এর দশকে তীব্র খরা দেখা গিয়েছিল যা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করেছিল। খরার কারণে ফসলহানি, পানির অভাব এবং পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেয়।

নদীভাঙন বাংলাদেশের নদ-নদী তীরবর্তী এলাকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। বর্ষাকালে নদীর স্রোত বাড়লে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। প্রতি বছর বহু পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বাস্তুভিটা হারায়। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং তাদের শাখা নদীগুলোর তীরবর্তী জেলাগুলোতে ভাঙনের প্রবণতা বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৫% বন্যাপ্রবণ এলাকা সরাসরি নদীভাঙনের শিকার।

বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। যদিও বড় ধরনের ভূমিকম্পের সংখ্যা কম, মাঝারি ও মৃদু ভূমিকম্প প্রায়ই অনুভূত হয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়া ভূমিকম্পে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ছোট ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। তবে, ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময় থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত একটি মারাত্মক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। মাঝে মাঝে শিলাবৃষ্টি ফসলের ক্ষতি করে। গ্রীষ্মকালে এই ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি ও পরিবেশের জন্য হুমকি।

বাংলাদেশে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবসময়ই প্রশংসার যোগ্য। তারা সর্বদা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং উদ্ধারকাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। দুর্যোগকালীন সময়ে সেনাবাহিনী তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে বিপদগ্রস্তদের সহায়তা করে থাকে। উদ্ধারকাজের জন্য হালকা ও শক্তিশালী স্পিডবোট ব্যবহার করা হয়, যা দ্রুত দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে সাহায্য করে। আকাশপথে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বহরে রয়েছে আধুনিক হেলিকপ্টার। এসব হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা হয় এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বা দুর্গম এলাকায় রসদ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর কার্গো প্লেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন প্রকার যানবাহন উদ্ধারকার্য পরিচালনা থেকে শুরু করে ত্রাণ বিতরণ এবং পরবর্তীতে পুনর্বাসন পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করে। তাদের পেশাদারিত্ব এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনী দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের কষ্ট লাঘবে নিরলসভাবে কাজ করে গেছে। তাদের এই মানবিক এবং সাহসী পদক্ষেপ দুর্যোগকবলিত মানুষের মনে সাহস ও ভরসা যুগিয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মৌলিক ও প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। প্রচলিত হুমকির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অসংখ্য সংখ্যক অপ্রচলিত কর্মকান্ডও পরিচালনা করে আসছে, যার মধ্যে প্রাকৃতিক দূর্যোগ অন্যতম। সরকার কর্তৃক কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় In Aid to Civil Power এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করে থাকে। এ কাজের সমন্বয় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এর মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সফলভাবে বিভিন্ন দুর্যোগ প্রস্তুতি, দুর্যোগ সময়কার কার্যক্রম এবং দূর্যোগ পরবর্তী কার্যক্রম এই ০৩ টি পর্বে সমাধা করে।

দুর্যোগ প্রস্তুতি পর্বে সরকারী বিভিন্ন বিভাগ যেমন: পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন করা হয়। এছাড়াও সেনাবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় Disaster Response Exercise পরিচালনা করে থাকে এবং শান্তিকালীন সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামাদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সর্বদা প্রস্তুত রাখে।

দুর্যোগ চলাকালীন সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন দুর্যোগে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা প্রদান, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সরবরাহ এই পর্বে সংগঠিত হয়। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সেনাবাহিনী অস্থায়ী সেতু ও সড়ক নির্মাণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবিক সহায়তায় সেনাবাহিনী সর্বদা দেশ ও জনগণের পাশে থাকে। এছাড়াও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের সুরক্ষায় নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও জনগণের বন্ধু হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সাথে উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্ধার কাজের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অনেক বেদনা ও স্মৃতি। দুঃখজনকভাবে, পাহাড় ধসের ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সাহসী সদস্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি ঘটেছিল ২০১৭ সালের ১৩ই জুন, যখন রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ ভূমিধসের পর উদ্ধারকাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় আরও একটি ভূমিধসের শিকার হন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেদিনের ঘটনা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় একের পর এক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। প্রথম ভূমিধসের পর যখন সেনাবাহিনীর দল দুর্গতদের উদ্ধারের জন্য এবং রাস্তা পরিষ্কারের জন্য ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন আবারও একটি বড় ধরনের ভূমিধস তাদের উপর আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা মাটি ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে যান। এই দুঃখজনক ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাঁর কয়েকজন অত্যন্ত সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ অফিসার এবং সৈনিককে হারিয়েছে। তাদের এই আত্মত্যাগ দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর অকুতোভয় ভূমিকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

গত ২০২৩ সালে রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড অথবা ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। সমগ্র দেশে বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নানাবিধ দুর্যোগে সেনাবাহিনী জনবল, সরঞ্জাম ও লজিস্টিকস্ সহায়তা প্রদান করে উদ্ধার অভিযান কে ত্বরান্বিত করেছে। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিসকেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব দিয়ে সহযোগিতা করেছে।

গত ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ চলাকালীন মাইলস্টোন স্কুলের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। সেনা সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহসিকতায় প্রাণহানির মাত্রা অনেকাংশে কমে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়। দ্রুত আহতদের উদ্ধার থেকে শুরু করে হাসপাতালে স্থানান্তর পর্যন্ত সেনাসদস্যগণ তাদের পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের দেশপ্রেম এবং পেশাদারিত্বের বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কোভিড মহামারির সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডাক্তারগণ নিজেদের জীবন বাজি রেখে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে মানবতার এক অনন্য নজির স্থাপন করে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল কোভিড মহামারির সময় রোল মডেল। দেশের বিভিন্ন স্থানে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী কোভিড মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই দুর্যোগগুলোর তীব্রতা এবং অপ্রত্যাশিততা আরও বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ। এই সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুর্যোগের পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নত করা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির হাত থেকে বাঁচতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করা, অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ক্ষতিগ্রস্থদের দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাই এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক অথচ ধ্বংসাত্মক নিয়মাবলীকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্যোগের ভয়াবহতাকে অবশ্যই কমিয়ে আনা সম্ভব। সার্বিকভাবে মানবিক দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দূর্যোগ মোকাবেলায় দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা দূর্যোগকালে মানুষের জীবনরক্ষা ও দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে। পরিশেষে বলা যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশ এবং দেশের মানুষের জন্যই কাজ করে যাচ্ছে তাদের অসাধারণ অবদান বাংলাদেশের মানুষ কখনোই ভুলতে পারবে না। বাংলাদেশের দুঃসময়ের বন্ধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অবদান চিরঞ্জীব থাকুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।